হাজারি গুড়

মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় বাংলাদেশের আর সব গুড় থেকে আলাদা। নানা কারণে এর সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে
তখন ইংরেজ শাসন চলছে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অধীনে। মানিকগঞ্জ থেকে তার জন্য উপহার হিসেবে পাঠানো হলো গুড়। রানি সেই গুড় হাতে নিয়ে চেপে ধরতেই হাজারটা টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। রানি বলে উঠলেন থাউজেন্স। যার বাংলা হলো হাজার। এই হাজারের বিশেষণ হলো হাজারি। আর সেই থেকে বংশের নাম হলো হাজারি এবং গুড়ের নাম হাজারি গুড়।
একথা গ্রামের পুরোনো লোকমুখে প্রচলিত। তারা বেশ গর্বের সঙ্গে অবলীলায় বলে যায় এমন গল্প। তবে এখানেই শেষ নয়। সে সময় রানি খুশি হয়ে হাজারি নামে একটা সিল বানিয়ে দেন। মজার বিষয় হলো, সিলের ভেতরে হাজারি লেখা বাংলায়। যা আজ পর্যন্ত আছে হাজারি বংশের মানুষের কাছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রানি কেন লিখবেন বাংলায়? অথবা ধরি, রানির মনে বেশ মায়া জন্মেছে, তাই তিনি লিখতে বলেছেন বাংলায়। কিন্তু রানির দেশে কে জানত বাংলা লেখা? তবে কি এই গল্প শুধু গল্প, নাকি সত্যি তিনি বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন?
যা হোক, এ চিন্তা করতে যদি ইচ্ছে হয়, তবে এক টুকরো হাজারি গুড় মুখে নিতে হবে। চিন্তা যেন স্বাদেই হারিয়ে যাবে। গন্ধে মাতিয়ে দেবে। বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন সেই গ্রামের সাদা মনের মানুষগুলোর মতো। এই সিল রানি নিজে বানিয়ে পাঠিয়েছেন।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার ঝিটকার গাছি বাড়িতে তৈরি হয় এই গুড়। বংশপরম্পরা ধরে রেখে এখনো চলছে এই গুড় তৈরির কাজ। মানিকগঞ্জের খেজুরগাছের দুই-তৃতীয়াংশই রয়েছে হরিরামপুর উপজেলায়। সেখানে প্রতি একরে ১৫টি খেজুরগাছ দেখা যায়। গুণে মানে স্বাদে গন্ধে এই হাজারি গুড়ের বিস্তর সুনাম রয়েছে। গ্রাম-শহর-দেশ ছাড়িয়ে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি এক পরিচিত নাম। এ গুড়ের স্বাদ, গন্ধ অন্য যেকোনো গুড়ের থেকে আলাদা। যেমন স্বাদে অনন্য, তেমনি চাহিদায় বিপুল।
মানিকগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয় সেখানকার জীবনধারায় মিশে থাকা লোকসংগীত আর গুড়। বাংলায় যত বিচার গান প্রচলিত, সেগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এই গ্রাম থেকে রচিত। লালন সাঁইয়ের সমসাময়িক ফকির বাউল রশিদ সরকারের রচনা এই গান। এ ছাড়া এখানে পদ্মার পাড় ধরে গড়ে উঠেছে মুরশিদী গানের চল। এ গানের মূল ধারা হলো মারেফতি। যাতে কোনো শরিয়ত থাকে না। থাকে রাগ-অভিমান, আনন্দ-বেদনা, হাহাকারের মাঝে ছন্দে তালে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা সেই ‘তাকে’। এখানে অনেক দরবেশ-অলির মাজার। এসবের মাঝেই মুক্তার মতো হয়ে আছে হাজারি গুড়। এগুলোর সঙ্গে একটা মিল আছে।
শীত এলেই বাউলের উৎসব একদিকে গ্রাম মাতায়, অন্যদিকে হাজারি গুড় মাতায় তার স্বাদে। খেজুরগাছের রস দিয়ে তৈরি করা হয় হাজারি। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া হাজারি গুড় হয় না। তাই আগের দিন দুপুর থেকে শুরু হয় প্রস্তুতি। বিকেলের মধ্যে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। রাতভর তীব্র শীতে হাঁড়িতে জমা হয় খেজুরের রস। পরদিন সূর্য ওঠার আগে তা সংগ্রহ করে ছেঁকে জ্বালায় (মাটির তৈরি পাত্র) রেখে বাইনে (চুলা) জ্বালিয়ে শুরু করা হয় গুড় তৈরি। জ্বাল চলতে চলতে একসময় নিজেদের বিশেষ কিছু পদ্ধতিতে তৈরি হয়ে যায় হাজারি গুড়। এই কাজ শুরু হয় ভোরে, যখন সূর্য কেউ দেখেনি, আর শেষ হয় সকাল নয়টা থেকে দশটার মধ্যে। এই পদ্ধতি এখন আর হাজারি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিন্তু মজার বিষয় হলো, পদ্ধতি জেনে গেলেও স্বাদের খেলায় হার মেনে যায় বাকি সবাই। এই গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। 
হাজারি গুড়ের প্রথা আজও ধরে রেখেছেন জাহীদ হাজারি ও শাহীদ হাজারি। তারা মূলত গাছ কাটা এবং সেখান থেকে রস এনে গুড় বানানোর কাজ করে থাকেন। এ ছাড়া রইস হাজারি এই গুড় হাটে নিয়ে বিক্রি করেন। প্রতি কেজি গুড় ১০০০ টাকায় বিক্রি হয়।
এর বৈশিষ্ট্য অন্য যেকোনো গুড় থেকে আলাদা। হাতে নিয়ে চেপে ধরলেই এটি গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যায় আর বাতাসে ছাতুর মতো উড়ে যায়। সাদা একধরনের কাগজ দিয়ে এটি মুড়িয়ে রাখা হয়। কারণ হলো, বাতাসে পড়ে থাকলে এই গুড় উড়ে যায়।
হাজারি গুড় নিয়ে গল্পের শেষ নেই। রইস হাজারিও বলেন তেমন গল্প। ‘হাজারি প্রামাণিক উঠলেন গাছে। গাছ কেটে রসের খোরা ঝোলাবেন। তখনই নিচ দিয়ে হেঁটে হাচ্ছিলেন এক দরবেশ। গাছ থেকে নেমে এলেন হাজারি, দরবেশ বললেন, ‘আমাকে রস খাওয়া।’ তিনি বুঝতে পারলেন, এর পেছনে কোনো অর্থ আছে। কিছু চিন্তা না করেই উঠে গেলেন আবার গাছে। নামিয়ে নিয়ে এলেন রসের খোরা। দেখলেন তাতে বেশ রস জমা হয়ে গেছে। দিলেন দরবেশকে। দরবেশ সে রস খেয়ে হাজারিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী করবি তুই এই রস দিয়ে? মিষ্টি বানাবি?’ হাজারি বললেন, ‘হুজুর, রস দিয়া তো মিঠাই (গুড়) হইব।’ দরবেশ বললেন, ‘তুই যা বানাইতে চাইবি তাই হইবো।’ সেই তো সাত পুরুষ আগের কথা। তখন থেকেই শুরু হলো হাজারি গুড়ের পথচলা। এখনো চলছে।’
বছর কয়েক আগে মানিকগঞ্জে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এসেছিলেন এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেখানে তাকে উপহার কী দেয়া যায়, সেই নিয়ে এক দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো। সবাই যে যার মতো আলাদা উপহার নিয়ে এলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, তারা একই উপহার এনে হাজির হলেন। আর তা হলো হাজারি গুড়। অমর্ত্য সেন সবার এই একই উপহার হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। সঙ্গে করে নিয়েও গেলেন হাজারি গুড়।

লোকসংগীত, হাজারি গুড়
মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর

এই স্লোগানকে মানিকগঞ্জের জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। হাজারি গুড়ের সুনাম পুনরুদ্ধারে খেজুরের বীজ বপন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন সরকারি লোকজন। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মানিকগঞ্জে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে সংগীত ও হাজারি গুড় মেলা।

 জুনেদ আহমাদ মুহতাসীম মিশাল
ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *